বিউটি বোডিং | ভ্রমণকাল

বিউটি বোডিং

beauty-boarding
কফি হাউজে সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালি বিকেল গুলো সেই। মান্না দে’র গাওয়া কালজয়ী এই গানটি রচিত হয়েছিলো তার নিজস্ব পটভুমিতে। কিন্তু বাংলাদেশেও ছিলো এমন একটি কফি হাউজ যেখান থেকে বের হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অনেক খ্যাতনামা লেখক ও সাহিত্যিক। বলছিলাম বিউটি বোডিং এর কথা।

বিউটি বোর্ডং বাংলাদেশের পুরান ঢাকার বাংলা বাজারে ১নং শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত একটি দোতলা পুরাতন বাড়ি যার সাথে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস জড়িত এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গুণী মানুষদের আড্ডার একটি কেন্দ্র বা ইতিহাসের ভিত্তিভূমি বলে মনে করা হয়।

বিউটি বোডিং এর ইতিহাস

বিউটি বোর্ডিং বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। বাড়িটি ১১ কাঠা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামেই এর নামকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিংয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। পরবর্তীতে প্রহ্লাদ চন্দ্রের পরিবার ভারত গমন করে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকে। নগরের ভোজনরসিকরা এখানে ছুটে আসেন। আর নিয়মিত খান পুরোনো ঢাকার বইয়ের মার্কেটের নানা শ্রেণির মানুষ।

বিউটি বোর্ডিং এর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এখানে যারা আড্ডার আসরে আসতেন এদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাশগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাস, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শফিক রেহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, ভাষাসৈনিক ও পুস্তক প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান, সিকদার আমিনুর হক, জুয়েল আইচ প্রমুখ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক স্থানে এসেছিলেন নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু ও পল্লীকবি জসিমউদ্দীন। এসেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চল্লিশের দশকে এই আড্ডা পুরান ঢাকায় সুখ্যাতি লাভ করে। কবি শামসুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেক বিখ্যাত মানুষ এখানে আসতেন। আবদুল জব্বার খান এখানে বসেই লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি মুখ ও মুখোশের পাণ্ডুলিপি। সমর দাস বহু গানের সুর তৈরি করেছেন এখানে বসে। শামসুর রাহমান লিখেছেন – মনে পড়ে একদা যেতাম প্রত্যহ দুবেলা বাংলা বাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই বিউটি বোর্ডিং – এ পরষ্পর মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।

খাবার ও থাকার ব্যবস্থা

খাবার ঘরের দেয়ালে টাঙানো আছে প্রাচীন আড্ডার কয়েকটি ছবি। হঠাৎ করেই শিহরণ জাগবে এই ভেবে একসময় যে ঘরে খেয়ে গেছেন বহু গুণী মানুষ, আজ সেখানে আপনিও বসেছেন খাবার খেতে। তবে শিহরণ হারিয়ে যাবে সরষে ইলিশের ঘ্রাণে। জিহবায় পানি চলে আসবে মুহূর্তেই। পুরান ঢাকায় কম দামে পেট ভরা খাবার খেতে চাইলে বিউটি বোর্ডিং এর কোন বিকল্প নেই।

বিউটি বোর্ডিং এর খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোলের মতন নানান সুস্বাদু পদ। এছাড়া বিউটি বোর্ডিং এ ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে খরচ করতে হবে ২০০/২৫০ টাকা। মুরগি ও খাসির মাংস ১৮০, খিচুড়ি প্রতি প্লেট ৬০ টাকা, পোলাও ৭০ টাকা, সবজি ৩০ টাকা, বড়া ১০, চচ্চড়ি ৩০ আর একবাটি মুড়িঘণ্ট মিলবে মাত্র ৭০ টাকায়। বিউটি বোর্ডিংয়ে চাইলে রাত্রিযাপনও করা যায়। রয়েছে ১৭ টি রুম। রুম ভেদে ভাড়া পড়বে ৩০০-৫০০ টাকা।

বিউটি বোডিং কিভাবে যাবেন

ঢাকার যে কোন স্থান থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে বাসে চড়ে বাহাদুর শাহ ভিক্টোরিয়া পার্ক চলে আসুন। বাহাদুর শাহ্ পার্ক পেড়িয়ে এগিয়ে গেলেই বাংলাবাজার। আর বাংলাবাজার যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই বিউটি বোডিংয়ের রাস্তা দেখিয়ে দিবে। আর আপনি চাইলে গুলিস্থান থেকে সরাসরি রিক্সা নিয়েও বিউটি বোডিং এ যেতে পারবে।

আরো দেখুন

আহসান মঞ্জিল
রোজ গার্ডেন প্যালেস
বাহাদুর শাহ পার্ক
দৃষ্টি আকর্ষণ: আমাদের পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের পরিচয় বহন করে এবং এইসব পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। আর ভ্রমনে গেলে কোথাও ময়লা ফেলবেন না। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।