উয়ারী বটেশ্বর | ভ্রমণকাল

উয়ারী বটেশ্বর

wari-bateshwar-narsingdi
কত বিচিত্র বাংলার ইতিহাস। প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সকল ইতিহাসের স্বাক্ষী বাংলার মৃত্রিকা। কথিত আছে আলেকজান্ডার যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করার জন্য মনোস্থীর করেছিলেন তখন তিনি জানতে পারেন পূর্ব বঙ্গে গঙ্গা নদীর তীরে এক জাতীর বাস যাদের নাম গঙ্গারিডি। সেই গঙ্গারিডি জাতীর শৌর্য্য বির্য এবং প্রভাব প্রতিপত্তি এতোটাই ছিলো যে আলেকজান্ডার তাদের ভয়ে ভারতবর্ষ জয় না করেই পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন।

সেই বীর জাতীর বসবাস বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে তার সঠিক অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদ দের মাঝে দ্বন্ধ অনেক পুরানো। সম্প্রতি নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার উয়ারী বটেশ্বর গ্রামে মাটির নিচে খুঁজে পাওয়ার নিদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ মিলেছে এখানেই ছিলো গঙ্গারিডি জাতীর বসবাস।

উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদীর বেলাবো ও শিবপুর উপজেলায় অবস্থিত উয়ারী ও বটেশ্বর নামীয় দুটি গ্রামব্যাপী একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। ধারণা করা হয় এটি মাটির নিচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।

তবে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কৃত কিছু প্রত্ন নিদর্শনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যাণ্ডস এবং নিউজল্যাণ্ড তিনটি দেশের পরীক্ষাগারে কার্বন-১৪ পরীক্ষার প্রেক্ষিতে উয়ারীর বসতিকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় উৎখনন কর্ম চলমান রেখেছে। সর্বশেষ ২ জানুয়ারী ২০১৭ তারিখে উয়ারীতে উৎখনন কালে বেশ কিছু প্রত্ননিদর্শন সংগৃহীত হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি সমৃদ্ধ, সুপরিকল্পিত, প্রাচীন গঞ্জ বা বাণিজ্য কেন্দ্র। "সৌনাগড়া " যা গ্রিক ভূগোলবিদ, টলেমী তার বই " জিওগ্রাফিয়াতে" উল্লেখ করেছিলেন।

নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় উয়ারী এবং বটেশ্বর পাশাপাশি দুটো গ্রাম। আকারে উয়ারী বৃহত্তর। এই গ্রাম দুটোতে প্রায়ই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যেত। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে উয়ারী গ্রামে শ্রমিকরা মাটি খননকালে একটি কলসীতে সঞ্চিত মুদ্রা ভাণ্ডার আবিষ্কার করে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক হানিফ পাঠান সেখান থেকে ২০-৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এগুলো ছিলো বঙ্গভারতের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা। এ ভাবেই উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ শুরু হয়।

মুহম্মদ হানিফ পাঠান তৎকালীন সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকায় "প্রাচীন মুদ্রা প্রাপ্তি" শীর্ষক সংবাদ ছাপেন। তিনি তার ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠানকে এই এলাকার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সম্পর্কে সচেতন করে তুলছিলেন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বটেশ্বর গ্রামে স্থানীয় শ্রমিকরা দুটি লৌহপিণ্ড পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। ত্রিকোণাকৃতি ও এক মুখ চোখা, ভারী লৌহপিণ্ডগুলো হাবিবুল্লা পাঠান তার বাবাকে নিয়ে দেখালে তিনি অভিভূত হন। ঐ বছরের ৩০ জানুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকার রবিবারীয় সংখ্যায় "পূর্ব পাকিস্তানে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ ছাপেন হানিফ পাঠান।

এরপর ঐ এলাকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যেতে থাকে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে উয়ারী গ্রামের কৃষক জাড়ু মিয়া মাটি খননকালে ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রার একটি ভাণ্ডার আবিষ্কার করেন। ওই ভাণ্ডারে কমপক্ষে চার হাজারের মতো মুদ্রা ছিল। ওজন ছিলো নয় সের। জাড়ু মিয়া মুদ্রাগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনুধাবন করতে না পেরে প্রতি সের আশি টাকা হিসেবে রৌপ্যকারের কাছে বিক্রি করে দেন। মাত্র ৭২০ টাকার জন্য ইতিহাসের অমূল্য সামগ্রীগুলো রৌপ্যকারের চুল্লিতে গলে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৭৪-১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে হাবিবুল্লা পাঠান ঢাকা জাদুঘরের অবৈতনিক সংগ্রাহক ছিলেন। তখন গবেষণার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, পাথরের গুটিকা, লৌহ কুঠার ও বল্লম জাদুঘরে দান করেন তিনি। ঐ সময় রাইঙ্গারটেক গ্রাম থেকে প্রাপ্ত ত্রিশটি লৌহ কুঠার জাদুঘরে প্রদান করেন তিনি।

১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে উয়ারী গ্রামের শাহাবুদ্দিন মাটির নিচ থেকে ব্রোঞ্জের ৩৩টি পাত্রের একটি সঞ্চয় উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে সেগুলো মাত্র ২০০ টাকায় এক ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করে দেন শাহাবুদ্দিন। হাবিবুল্লা পাঠান একসময় স্থানীয় শিশু-কিশোরদেরকে প্রাচীন প্রত্নসামগ্রী কুড়িয়ে দেয়ার বিনিময়ে সামান্য কিছু পয়সা দিতে লাগলেন আর সংগ্রহ করতে লাগলেন উয়ারী-বটেশ্বর এলাকার অনাবিষ্কৃত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

তাঁর একাগ্র শ্রমেই খননের আগেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিলো বঙ্গভারতের দুর্লভ একক নিদর্শন বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জের তৈরি ধাবমান অশ্ব, উচ্চমাত্রায় টিনমিশ্রিত হাতলওয়ালা পাত্র, শিব নৈবেদ্য পাত্র, রেলিক কাসকিট-এর ভগ্নাংশ, পাথরের বাটখারা, নব্যপ্রস্তর যুগের বাটালি, লৌহকুঠার, বল্লম, পাথরের তৈরি সিল, ত্রিরত্ন, কচ্ছপ, হস্তী, সিংহ, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র , তারকা, রক্ষাকবচ, পোড়ামাটির কিন্নর, সূর্য ও বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি, রিংস্টোন, ব্রোঞ্জের গরুড়, কয়েক সহস্র স্বল্প মূল্যবান পাথর ও কাচের গুটিকা।

বর্তমানে উয়ারী বটেশ্বর একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিনিয়ত এখানকার মাটির নিচে সন্ধান মিলছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের। আশা করা যায় এখানে খনন কাজ চালালে বেড়িয়ে আসবে বাংলার ইতিহাসের আরো অনেক প্রাচীন নিদর্শন।

উয়ারী বটেশ্বর কিভাবে যাবেন

রাজধানী ঢাকার গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন পরিবহণের বাস সরাসরি ঢাকা-নরসিংদী রুটে যাতায়াত করে। এছাড়া কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন হতে ট্রেনে নরসিংদী ভ্রমণ করা যায়। আবার মহাখালী থেকে ভৈরবগামী বিআরটিসি বাসে জনপ্রতি ১৫০ টাকা ভাড়ায় দুই ঘণ্টায় ভৈরবের মরজাল বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া যায়। সেখান থেকে লোকালে জনপ্রতি ৩০ টাকা অথবা ১৫০-২০০ টাকায় সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে সরাসরি উয়ারী বটেশ্বর যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

উয়ারী বটেশ্বরে একটি সরকারী ডাকবাংলো আছে। এখানে থাকার জন্য এর চেয়ে ভাল ও সুন্দর জায়গা পাওয়া যাবে না। ডাকবাংলোটি বুকিং দিতে নন-রুমের জন্য ৫০০ টাকা এবং এসি রুমের জন্য ১২০০ টাকা খরচ করতে হবে। আর কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলে খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। কেয়ারটেকার লিটনের ফোন নাম্বার- ০১৯৩৩-২৫১২৪২। এছাড়াও নরসিংদী জেলা শহরে বিভিন্ন মানের কয়েকটি আবাসিক হোটেলে স্বল্প মূল্যে রাত্রিযাপনের সুযোগ রয়েছে।


আরো দেখুন

দৃষ্টি আকর্ষণ: আমাদের পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের পরিচয় বহন করে এবং এইসব পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। আর ভ্রমনে গেলে কোথাও ময়লা ফেলবেন না। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
 আমাদের টিম সবসময় চেষ্টা করে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা বানান ভুল হয়ে থাকে বা ভ্রমণ স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে অথবা আপনার কোন ভ্রমণ গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান তাহলে Comments করে জানান অথবা আমাদের কে ''আপনার মতামত'' পেজ থেকে মেইল করুন।