বিরিশিরি | ভ্রমণকাল

বিরিশিরি

birishiri-durgapur
বিরিশিরির মূল আকর্ষণ বিজয়পুর চীনামাটির খনি। বিরিশিরি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। বিরিশিরির বিজয়পুরে আকর্ষনীয় চীনামাটির পাহাড় ও নীল পানির হ্রদ রয়েছে। বিজয়পুরের এই চীনামাটির পাহাড় এবং সমভূমি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬ কিলোমিটার ও প্রস্থে ৬০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। বিরিশিরির সৌন্দর্য আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেবে সব ব্যস্ততা। বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হচ্ছে চিনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদামাটি পানির রঙটাকে যেন আরো বেশি গাঢ় করে দিয়েছে। তবে বিরিশিরি গিয়েই আপনি এ সুন্দর দৃশ্য দেখতে পারবেন; সেটা কিন্তু না।

আপনাকে যেতে হবে আরেকটু দূর বিজয়পুর চিনামাটির পাহাড়ে। বিচিত্রময় সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, কংশ-টেপা-সোমেশ্বরীর কাশবন আর দূরে আকাশে হেলান দিয়ে গম্ভীর গারো পাহাড়ের ধ্যানমগ্ন প্রতিকৃতি সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই সৌন্দর্যপিপাসুদের মন কেড়ে নেয়। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক গুণ।

বিরিশিরিতে যা যা দেখবেন

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি
এক সময় দুর্গাপুর ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী। ৩ হাজার ৩শ’ ৫৯ বর্গমাইল এলাকা ও প্রায় সাড়ে ৯শ’ গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। বর্তমানে এটি নেত্রকোনার একটি উপজেলা। সোমেশ্বর পাঠক থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী বংশধররা প্রায় ৬৬৭ বছর শাসন করেন এ রাজ্য। কিন্তু রাজকৃষ্ণ নামে এক রাজার শাসনামল থেকে সুসং রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজপরিবারে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ফলে এক সময় গোটা রাজ্য চারটি হিস্যায় ভাগ হয়ে যায় এবং চারটি পৃথক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাড়িগুলো ‘বড় বাড়ি’, ‘মধ্যম বাড়ি’, ‘আবু বাড়ি’ (ছোট অর্থে) ও ‘দু’আনি বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী
দুর্গাপুরের বাসস্ট্যান্ড এর পাশেই অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী । এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে।

টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ
১৯৪৬-৫০ সালে তখনকার জমিদার বাড়ির ভাগ্নে কমরেড মণিসিংহের নেতৃত্বে জমিদারদেরই বিরুদ্ধে শুরু হয় টঙ্ক আন্দোলন।

টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, দুর্গাপুর
টংক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয় স্মৃতিসৌধ। সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে কিছ দূর গেলে এম.কে.সি.এম হাই স্কুলের পাশে গেলেই চোখে পড়বে এ স্মৃতিসৌধটি। মরহুম রাজনীতিবিদ জালাল উদ্দিন তালুকদারের দানকৃত জমিতে এ স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর কমরেড মণিসিংহের মৃত্যু দিবসে এখানে পাঁচ দিনব্যাপী মণিসিংহ মেলা নামে লোকজ মেলা বসে।

সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী
সুসং দুর্গাপুর থেকে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে রিকশায় যেতে হয় রানিখং গ্রামে। এখানে আছে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। রানিখং গ্রামের এ ক্যাথলিক গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১২ সালে।

হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ
দুর্গাপুর বাজার থেকে বিজয়পুর পাহাড়ে যাওয়ার পথে কামারখালী বাজারের পাশে বহেরাতলীতে অবস্থিত রাশিমণি এই স্মৃতিসৌধ। সীমান্তবর্তী, গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘বগাঝরা’ নামক গ্রামটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী গ্রামগুলোর মধ্যে একটি।রাশিমণি সেই গ্রামেরই একজন প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন।ব্রিটিশ মহাজন ও জোতদারদের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান এবং হয়ে ওঠেন টংক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।

সাদা মাটির পাহাড়
দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া ও মাইজপাড়া মৌজায় বিজয়পুরের শসার পাড় এবং বহেরাতলী গ্রামে সাদা মাটি অবস্থিত। এখান থেকে চীনা মাটি সংগ্রহের ফলে পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট পুকুরের মতো গভীর জলাধার। পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ নীল রঙের জলাধার গুলো দেখতে অত্যন্ত চমৎকার।

সোমেশ্বরী নদী
সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি আর ধুধু বালুচরের জন্য বিখ্যাত। সোমেশ্বরী নদী বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলায় প্রবাহিত একটি নদী। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি। ।

কংশ নদী
কংশ নদী ভারতের মেঘালয় ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের শিলং মালভূমির পূর্বভাগের তুরার কাছে গারো পাহাড়ে এই নদীটির উৎপত্তি।

আত্রাখালি নদী
আত্রাখালি নদী সুসঙ্গ দুর্গাপুর বাজারের উত্তর দিক দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। কিছু দূর এগিয়ে সোমেশ্বরীর মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এ ছাড়াও যেতে পথে পড়বে সেন্ট যোসেফের গির্জা। গির্জাটা বেশ সাজানো-গোছানো, নীরব আর খুব সুন্দর। তারপর এসে পৌঁছবেন বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড়ে। পাহাড় ও সমভূমিসহ এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৬০০ মিটার। বিস্তর পাহাড়জুড়ে রয়েছে সাদামাটি। কিছু কিছু জায়গায় লালচে মাটিও দেখা যায়। পাহাড় থেকে মাটি কাটায় সেখানে হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে যার পানি কোথাও স্বচ্ছ নীল কোথাও সবুজাভ নীল কোথাও বা একদম লাল। তবে লাল পানি এখন নেই বললেই চলে। এই হ্রদের নীল পানি যেন আপনার সব অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করে দেবে। শ্বেত-শুভ্র চিনামাটির পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে অপরূপ নীলের উৎস সোমেশ্বরী নদী। যা বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়াও দুর্গাপুর থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর সীমান্তে পাহাড়ের চূড়ায় রানীখং গির্জা অবস্থিত। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে বিরিশিরির সৌন্দর্য যেন অন্য মাত্রা পায়।

বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই কমলা রানী দীঘি। এই কমলা রানী দীঘি সাগর দীঘি নামেও পরিচিত। দীঘিটি পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়ে গেলেও এর দক্ষিণ-পশ্চিম পাড় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। বিরিশিরির নিরিবিলি কোলাহলহীন ছিমছাম শান্ত পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এমন পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেও আপনার খারাপ লাগবে না। এ ছাড়া দু’চোখ যেদিকে যাবে দেখবেন শুধুই পাহাড়। তবে এগুলোর বেশির ভাগই ভারতে।

বিরিশিরি কিভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে সরকার এবং জিন্নাত পরিবহণের বাস ছেড়ে যায়। এ দুটি বাসে চড়ে দুর্গাপুর যেতে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা লাগে। দুর্গাপুর বলা হলেও সাধারণত এই বাসগুলো সুখনগরী পর্যন্ত যায়। সুখনগরী থেকে নৌকায় করে একটা ছোট নদী পার হয়ে রিকশা, বাস বা মোটর সাইকেলে দূর্গাপুর যেতে হয়। বাস যেতে ২০ টাকা, রিকশায় যেতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং মোটর সাইকেলে ২ জন ১০০ টাকা ভাড়ায় দুর্গাপুর যাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে রাত ১১ টা ৫০ মিনিটে হাওড় এক্সপ্রেস নামের ট্রেনে করে শ্যামগঞ্জ ট্রেন স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজি ভাড়া নিয়ে বিরিশিরি বাজার যাওয়া যায়। কিংবা একটু সহজে যেতে চাইলে হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনে নেত্রকোনা এসে চল্লিশা বাজার থেকে মোটর সাইকেলে জনপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় সব স্পট দেখে ফিরতে পারবেন। এছাড়া বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভোর ৪.০০/৪.৩০ তে যাত্রা করা জারিয়া স্টেশনগামী ট্রেনে করে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় জারিয়া এসে ট্রলার, অটো, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে করে দূর্গাপুর যাওয়া যায়।

দুর্গাপুর থেকে ঢাকা ফিরতে দুর্গাপুরের তালুকদার প্লাজার সামনে থেকে রাত ১১ টা এবং ১১ টা ৩০ মিনিটে দুটি নাইট কোচ ঢাকার মহাখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এছাড়া জারিয়া ট্রেন ষ্টেশনে হতে দুপুর ১২ টায় একটি ট্রেন ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে।

কোথায় খাবেন

বিরিশিরিতে ঘুরার সময় হালকা খাবার সাথে রাখতে পারেন কারণ যত্রতত্র খাবারের কিছু পাওয়া যায় না। এখানে মধ্যম মানের কিছু খাবার হোটেল বা রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে ভাত, ডাল, মাছ, মাংসের পাশাপাশি বকের মাংসও পাওয়া যায়। দূর্গাপুর বাজারে নেত্রকোণার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুল করবেন না।

কোথায় থাকবেন

সুসং দুর্গাপুরে রাত্রিযাপনের জন্য জেলা পরিষদ ডাক বাংলো, বেশকিছু গেস্ট হাউস এবং মধ্যম মানের আবাসিক হোটেল আছে। প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন – জেলা পরিষদ ডাক বাংলো (01558380383, 01725571795), ইয়ুথ মেন খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন বা ওয়াইএমসিএ-এর রেস্ট হাউস(01818613496, 01716277637, 01714418039, 01743306230, 01924975935, 01727833332), YWCA গেষ্ট হাউজ( 01711027901, 01712042916), ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী গেষ্ট হাউজ ( 09525-56042, 01815482006)

দুর্গাপুরে মধ্যম মানের হোটেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – স্বর্ণা গেস্ট হাউস ( 0171228698, 01728438712), হোটেল সুসং (01914791254), হোটেল গুলশান(01711150807), হোটেল জবা (01711186708, 01753154617), নদীবাংলা গেষ্ট হাউজ ( 01771893570, 01713540542)। এই হোটেলগুলোতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

আরো দেখুন

দৃষ্টি আকর্ষণ: আমাদের পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের পরিচয় বহন করে এবং এইসব পর্যটন স্পট গুলো আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। আর ভ্রমনে গেলে কোথাও ময়লা ফেলবেন না। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।